টপিকঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্প

আমাদের অনেকেই রবী ঠাকুরের পোস্ট মাস্টার পড়েছি হয়তো , কিন্তু কেও যদি পড়ে না থাকেন তবে বর্তমান সময়ের বাস্তব পোস্ট মাস্টার এর গল্প টা পড়ে ফেলুন আকাঙক্ষা আর-ও বেড়ে  যাবে।

অবশেষে পোস্টমাস্টার
তারিখ: ২৭-০৯-২০১০


শেষ হইয়াও হইল না শেষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্প দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে

উলাপুর গ্রাম হইতে ফিরিবার পর কিছুদিন আমাদের পোস্টমাস্টার ইতস্তত ঘুরিয়া বেড়াইয়াছে। তাহার মাতা ভারতী দেবী তাহাকে জগৎপুর বিদ্যালয়ে মাস্টারিতে ঢুকাইয়া দিয়াছে, তাহাও বেশ কয়েক দিন হইয়া গেল। কয়েক দিন ধরিয়া কথাটি পাড়িবেন বলিয়া মনস্থির করিয়া রাখিয়াছেন ভারতী দেবী। কিন্তু সংসারের সকল ঝামেলা শেষ করিয়া তিনি যখন ঘুমাইতে আসেন, ততক্ষণে কর্তার এক পশলা ঘুম হইয়া ওঠে। কিন্তু আজ তাহাকে বলিতেই হইবে, না হইলে বিলম্ব হইয়া যাইতে পারে। অন্যান্য দিনের মতো তাহার বড় কন্যা কেতকী তাহার একমাত্র ননদ বিনোদিনীকে লইয়া এই বাড়িতে আসিয়াছিল। কন্যা বাপের বাড়িতে আসিবে তাহাতে কোনো উৎকণ্ঠা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কেতকীর সঙ্গে ইদানীং তাহার ননদ বিনোদিনীও আসে এবং কেতকী প্রায়ই তাহার দাদার ঘরে গল্প করিতে থাকে। ভারতী দেবীর আশঙ্কা যে সত্য তাহা আজ কেতকী নিজ মুখে স্বীকার করিয়াছে। বলিয়াছে বিনোদিনী দেখিতে সুন্দর, তাহাদের পালটি ঘর এবং সর্বোপরি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাস দিয়াছে।
রাতের আহারের পর ভারতী দেবী সকলকে কাজ শেষ করিবার তাড়া লাগাইলেন এবং অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেক আগে শয়নকক্ষে প্রবেশ করিলেন। ভারতী দেবীকে দেখিয়া কর্তা বিছানায় উঠিয়া বসিলেন।
‘কয়েক দিন ধরিয়া আপনাকে একটি কথা বলিতে চাহিতেছি। কথাটি আমাদের মাস্টার সম্পর্কে।’
শুনিয়া কর্তা একটু চমকাইয়া উঠিলেন।
তবে এরপর ভারতী দেবী গড়গড় করিয়া যা বলিয়া গেলেন তাহাতে তিনি উৎকণ্ঠিত হইলেন না। ভারতী দেবীর কথার সারাংশ হইল, মাস্টারের জন্য পাত্রী সন্ধান করা দরকার। তিনি ছোটবেলা থেকে তাহার বড় বোন ইন্দিরা দেবীর কলেজপড়ুয়া মেয়ে সুহাসিনীকে এ বাড়িতে বউ করিয়া আনিবেন বলিয়া স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। তিনি কালই বড়দির বাড়িতে যাইতে চান।
সকল কথা শুনিয়া কর্তা বলিলেন, ‘সে তুমি যা ভালো মনে করো।’ এই কথা বলিয়া আবার শুইয়া পড়িলেন।

২.
পরের দিনই ভারতী দেবী ছোট মেয়ে বুবানীকে লইয়া দুর্গাপুরে দিদি ঠাকরুনের বাসায় চলিয়া গেলেন। দুই ভগ্নির কী আলাপ হইয়াছে, তাহা আমরা জানিতে পারিলাম না। তবে দিন দুই পরে মাস্টার তাহার পড়া পড়িতে যাইয়া পুস্তকের মধ্যে একটি ছবি আবিষ্কার করিল। ছবির সুন্দর, সহাস্য মুখ এবং বিনুনি দোলানো মেয়েটিকে তাহার কেমন জানি চেনা চেনা মনে হইল। বুবানীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করা মাত্রই সে কহিল, ‘সে কি দাদা! তুমি হাসি দিদিকে চিনিতে পারিতেছ না। বড় মাসিমার মেয়ে গো। দেখেছ, কত সুন্দর হয়েছে। কেমন টিকোলো নাক।’
যত্ন করিয়া ছবির দিকে তাকাইতে গিয়া মাস্টারের জানি কী হইল। মাস্টারের হাতের ছবিতে হাসির সহাস্য মুখটি ক্রমশ বিলীন হইয়া গেল। সেখানে ফুটিয়া উঠিল এক গ্রাম্য বালিকার দুষ্টুমি-মাখা মুখ। মুখটি ক্রমশ জোরে জোরে পড়া পড়িতে শুরু করিল। মাস্টার দেখিল একটি একঘরের বাড়ি। সেখানে সে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকিতেছে। আর একটি কোমল হাত তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতেছে, মাথায় পট্টি বাঁধিয়া দিতেছে। মনের অজান্তে মাস্টারের হাত নিজ কপাল স্পর্শ করিল!
দিন কয়েক পরে কেতকী বাড়িতে আসিয়া দাদার অবস্থা দেখিয়া হইহই করিয়া উঠিল। বুবানীর কাছ থেকে সুহাসিনীর কথা শুনিয়া সে রাগিয়া উঠিল। ভাবিল, দাদাকেই খোলা মনে জিজ্ঞাসা করা যাক। বিনোদিনী না সুহাসিনী?
দুই ভগ্নির জোরাজুরিতে মাস্টার যাহা বলিল, তাহা শুনিবার জন্য কেতকী বা বুবানী কেহই প্রস্তুত ছিল না। মাস্টার তাহার পোস্টমাস্টার জীবনের সকল ঘটনা দুই ভগ্নিকে খুলিয়া বলিল। তাহার একাকী জীবনে বালিকার উপস্থিতি, তাহাকে পড়ানোর কথা এবং তাহার অসুস্থতার সময় সেই গ্রাম্যবালিকার একনিষ্ঠ সেবার কথা বর্ণনা করিয়া মাস্টার ঘোষণা করিল যে তাহার হূদয় ওই গ্রাম্যবালিকা দখল করিয়া রাখিয়াছে।
দুই বোন প্রথমে হতবাক হইলেও মা ও বাবার কাছে বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য তাহারা স্বীয় স্কন্ধে দায়িত্ব তুলিয়া লইল। কর্তার সায় থাকায় শেষ পর্যন্ত মায়ের মনও গ্রাম্য বালিকার প্রতি ঢলিয়া পড়িল। স্থির হইল, কেতকী ও বুবানীকে লইয়া মাস্টার আগামী রবিবার উলাপুর গ্রামে যাইবে। কেতকীর বরও সঙ্গে যাইবে।

৩.
নদীর ঘাটটির একটি পরিবর্তন মাস্টার লক্ষ করিল। ঘাটের সামনে যেখানে পারানির কড়ি আদায় করা হইতেছে, সেখানে একটি দোচালা ঘর উঠিয়াছে। বাড়ু মোড়ল মাস্টারকে চিনিতে পারিয়া বলিল, কী পোস্টমাস্টার। আমাদের মনে পড়িল নাকি? স্মিত হাসিয়া মাস্টার তাহার ভগ্নিদের লইয়া গ্রামের পথে রওনা হইয়া গেল। দ্রুত তাহারা পোস্ট অফিসের দিকে চলিয়া গেল। কিন্তু দেখা গেল পোস্ট অফিস বন্ধ।
বুবানীর পরামর্শে তাহারা সকলে দ্রুততার সঙ্গে মূল গ্রামের দিকে রওনা হইল। পথিমধ্যে মাস্টার তাহার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করিল এবং বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিল।
গ্রামে ঢুকিবার মুখে তাহাদের সঙ্গে ঘোষপাড়ার বাদল ঘোষের সঙ্গে দেখা হইয়া গেল। মাস্টারকে দেখিয়া বাদল ঘোষের মুখখানি আনন্দে ভরিয়া উঠিল। সে কহিল, আমি জানিতাম, খবর পাইলে আমাদের পোস্টমাস্টার নিজে আসিবে। তা তোমার সঙ্গে এরা কারা?
বাদল ঘোষের কথা শুনিয়া আগন্তুক দলটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল। কী খবর, কিসের খবর, আর তাহার সঙ্গে মাস্টারেরই বা কী সম্পর্ক? কাহারো মুখে কোনো কথা সরিল না। কেতকীর বরের মুখ দিয়া প্রথম কথা বাহির হইল, ‘কোন খবরের কথা বলিতেছেন? আমরা তো কলকাতা থেকে আসিয়াছি।’
‘আমি রতনের বিবাহের কথা বলিতেছি। আজ তো তাহার বিবাহ।’ বাদল ঘোষ জানাইলেন। খবরটি তাহারা জানে না শুনিয়া তিনি কিছুটা বিস্মিত হইয়াছেন।
বাদল ঘোষের কথা শুনিয়া মাস্টার দাঁড়ানো অবস্থা হইতে বসিয়া পড়িল। বুবানী তাহাকে ধরার চেষ্টা করিল। আর কেতকী অবাক হইয়া বাদল ঘোষের কাছে বলিল, ‘রতনের বিবাহ! কাহার সঙ্গে!’
‘কেন, মাস দুয়েক আগে যে নতুন পোস্টমাস্টার এখানে আসিয়াছে, তাহার সঙ্গে।’
                                                                                                               সূত্র:

মেডিকেল বই এর সমস্ত সংগ্রহ - এখানে দেখুন
Medical Guideline Books